বাংলা কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাংলা কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১১

তরঙ্গে তরঙ্গে আজ যেই গীত বাজে :: চিত্তরঞ্জন দাশ



কবিঃ চিত্তরঞ্জন দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ সাগর সঙ্গীত
কবিতাঃ তরঙ্গে তরঙ্গে আজ যেই গীত বাজে

তরঙ্গে তরঙ্গে আজ যেই গীত বাজে,
সোনার স্বপন ভরা প্রভাতের মাঝে;
সেই গীতে ভরি গেছে হৃদয় আমার,
গগনে পবনে বহে সেই গীত ধার!
কি মোরে করেছ আজ! মনখানি মম,
শত শত তন্ত্রীভরা গীতযন্ত্র সম, —
পরশি তোমার করে কাঁপিয়া কাঁপিয়া,
গরবে গৌরবে আজ উঠিছে বাজিয়া।

কোথায় রাখিব আজ এ সুখের ভার :: চিত্তরঞ্জন দাশ



কবিঃ চিত্তরঞ্জন দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ সাগর সঙ্গীত
কবিতাঃ কোথায় রাখিব আজ এ সুখের ভার

কোথায় রাখিব আজ এ সুখের ভার,
কারে দিব আজ মোর অশ্রু উপহার!
এ অজানিত সুখ, এ দুঃখ অজানা,—
বাধাহীন এ উৎসবে মানে না যে মানা।
সকল সুখের রাশি পুষ্প হ’য়ে ফুটে,
সব দুঃখ আজ মোর গীত হ’য়ে উঠে!
বিচিত্র এ গীত লোক, পুষ্পের কানন!—
কি জানি কেমন করে কাঁপিছে এমন!—
কোথায় রাখিব বল অন্তরের ভার,
তোমার উৎসবে আজি, হে সিন্ধু আমার!

ওই তো বেজেছ তব প্রভাতের বাঁশি :: চিত্তরঞ্জন দাশ



কবিঃ চিত্তরঞ্জন দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ সাগর সঙ্গীত
কবিতাঃ ওই তো বেজেছ তব প্রভাতের বাঁশি

ওই তো বেজেছ তব প্রভাতের বাঁশী –
আনন্দ উৎসবে ভরা! সূর্যকর রাশি
তোমার সর্বাঙ্গে আজ আনন্দে লুটায়,
উজল উছল জলে কুসুম ফুটায়!
গীতভরা স্বর্ণালোকে ফুটে পুষ্পদল,
তোমার চরণ বেড়ি করে টলমল!
তোমার সঙ্গীত আজি বিহঙ্গের প্রায়,
মাখি সে সোনার স্বপ্ন তার সর্ব গায়,
উড়িয়া বেড়ায় মোর হৃদয় আকাশে,
প্রেমের তরঙ্গে আর বসন্ত বাতাসে!

ভরিয়া গিয়াছে চিত্ত তোমারি ও গানে :: চিত্তরঞ্জন দাশ



কবিঃ চিত্তরঞ্জন দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ সাগর সঙ্গীত
কবিতাঃ ভরিয়া গিয়াছে চিত্ত তোমারি ও গানে

ভরিয়া গিয়াছে চিত্ত তোমারি ও গানে!
আমি শুধু চেয়ে আছি প্রভাতের পানে।
কখনো বাজিছে ধীর,
কখনো গভীর,
কখনো করুণ অতি, চোখে আনে জল,
উদ্দাম উন্মাদ কভু করিছে পাগল!
তোমার গীতের মাঝে,
কি জানি কি বাজে!
তোমার গানের মাঝে কি জানি কি বিহরে,—
আমার সকল অঙ্গ শিহরে, শিহরে!
ওই তব পরাণের অন্তহীন তানে;
আমি শুধু চেয়ে আছি প্রভাতের পানে।

আজিকে পাতিয়া কান :: চিত্তরঞ্জন দাশ



কবিঃ চিত্তরঞ্জন দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ সাগর সঙ্গীত
কবিতাঃ আজিকে পাতিয়া কান

আজিকে পাতিয়া কান,
শুনিছি তোমার গান,
হে অর্ণব! আলো ঘেরা প্রভাতের মাঝে
একি কথা! একি সুর!
প্রাণ মোর ভরপুর,
বুঝিতে পারিনা তবু কি জানি কি বাজে
তব গীত মুখরিত প্রভাতের মাঝে!

সাগর সঙ্গীত



কবিঃ চিত্তরঞ্জন দাশ
কাব্যগ্রন্থঃ সাগর সঙ্গীত
কবিতাঃ সাগর সঙ্গীত

হে আমার আশাতীত হে কৌতুকময়ি!
দাঁড়াও ক্ষণেক। তোমা, ছনে গেঁথে লই!
আজি শান্ত সিন্ধু ওই ম্লান চন্দ্র করে
করিতেছে টল্‌মল্ কি যে স্বপ্ন ভরে!
সত্যই এসেছ যদি হে রহস্যময়ি!
দাঁড়াও অন্তর মাঝে ছন্দে গেঁথে লই।
দাঁড়াও ক্ষণেক! আমি অর্ণবের গানে,
পরিপূর্ণ শব্দহীন, অন্তরের তানে,
ছন্দাতীত ছন্দে আজি তোমারে গাঁথিব
অন্তর বিজনে আমি তোমারে বাঁধিব!
তুমি কি রবেনা সেথা, হে স্বপ্ন-অঞ্চলা!
ছন্দবদ্ধ, পরিপূর্ণ নিত্য অচঞ্চলা!

(কবি) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ

'সাগর সঙ্গীত' দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের একটি কাব্যগ্রন্থ। রচনাকালের হিসেবে এটি তাঁর তৃতীয় এবং প্রকাশকালের হিসেবে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। ১৯১১ সালের পূজার ছুটির সময় ইংল্যান্ড যাত্রাকালে কাব্যটি রচিত হয়। কবিতাগুলির বিষয় প্রকৃতি এবং এগুলির মধ্যে একটি অখণ্ড ভাবপ্রবাহ রক্ষিত হয়েছে। মূল গ্রন্থে কবিতাগুলির কোনো শিরোনাম নেই, এগুলি সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে। এই কাব্যের প্রথম প্রকাশক ছিলেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সনস, কলকাতা। বেঙ্গল লাইব্রেরির ক্যাটালগে গ্রন্থটি সম্পর্কে লেখা হয়, ‘Lyrical poems on the Ocean and its various majestic scenes.’ অরবিন্দ ঘোষ প্রথমে ইংরেজি গদ্যে এই কাব্যের অনুবাদ করেন; পরে তিনিই শ্রীঅরবিন্দ নামে ইংরেজি পদ্যে এই কাব্যের অনুবাদ করেছিলেন। ১৯২৩-২৪ সাল নাগাদ ‘Songs of the Sea’ নামে এই ইংরেজি অনুবাদটি মাদ্রাজ (অধুনা চেন্নাই) থেকে প্রকাশিত হয়।

সংগ্রহেঃ http://bn.wikisource.org

বুধবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১০

মেঘের পরে মেঘ জমেছে

মেঘের পরে মেঘ জমেছে
লেখক:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/Rabindranath Thakur
ক্যাটাগরী: বাংলা কবিতা/Bangla Kobita

মেঘের পরে মেঘ জমেছে,
আঁধার করে আসে-
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লোকের মাঝে,
আজ আমি যে বসে আছি
তোমারই আশ্বাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।

তুমি যদি না দেখা দাও
কর আমায় হেলা,
কেমন করে কাটে আমার
এমন বাদল-বেলা।
দূরের পানে মেলে আঁখি
কেবল আমি চেয়ে থাকি,
পরাণ আমার কেঁদে বেড়ায়
দুরন্ত বাতাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১০

ঝর্ণা

ঝর্ণা
লেখক: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ক্যাটাগরী: বাংলা কবিতা

ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!
তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা!
অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনু ভরি' যৌবন, তাপসী অপর্ণা!
ঝর্ণা!
পাষাণের স্নেহধারা! তুষারের বিন্দু!
ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল সিন্ধু|
মেঘ হানে জুঁইফুলী বৃষ্টি ও-অঙ্গে,
চুমা-চুমকীর হারে চাঁদ ঘেরে রঙ্গে,
ধূলা-ভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ধর্ণা!
ঝর্ণা!
এস তৃষার দেশে এস কলহাস্যে -
গিরি-দরী-বিহীরিনী হরিনীর লাস্যে,
ধূসরের ঊষরের কর তুমি অন্ত,
শ্যামলিয়া ও পরশে কর গো শ্রীমন্ত;
ভরা ঘট এস নিয়ে ভরসায় ভর্ণা;
ঝর্ণা!
শৈলের পৈঠৈয় এস তনুগত্রী!
পাহাড়ে বুক-চেরা এস প্রেমদাত্রী!
পান্নার অঞ্জলি দিতে দিতে আয় গো,
হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গার প্রায় গো,
স্বর্গের সুধা আনো মর্ত্যে সুপর্ণা!
ঝর্ণা!
মঞ্জুল ও-হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে
ওলো চঞ্চলা ! তোর পথ হল ছাওয়া যে!
মোতিয়া মোতির কুঁড়ি মূরছে ও-অলকে;
মেখলায়, মরি মরি, রামধনু ঝলকে
তুমি স্বপ্নের সখী বিদ্যুত্পর্ণা
ঝর্ণা!

দূরের পাল্লা

দূরের পাল্লা
লেখক: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ক্যাটাগরী: বাংলা কবিতা

ছিপখান তিন-দাঁড় -
তিনজন মাল্লা
চৌপর দিন-ভোর
দ্যায় দূর-পাল্লা!
পাড়ময় ঝোপঝাড়
জঙ্গল-জঞ্জাল,
জলময় শৈবাল
পান্নার টাঁকশাল |
কঞ্চির তীর-ঘর
ঐ-চর জাগছে,
বন-হাঁস ডিম তার
শ্যাওলায় ঢাকছে|
চুপ চুপ - ওই ডুব
দ্যায় পান্ কৌটি
দ্যায় ডুব টুপ টুপ
ঘোমটার বৌটি!
ঝকঝক কলসীর
বক্ বক্ শোন্ গো
ঘোমটার ফাঁক বয়
মন উন্মন গো|
তিন-দাঁড় ছিপখান
মন্থর যাচ্ছে,
তিনজন মাল্লায়
কোন গান গাচ্ছে?
রূপশালি ধান বুঝি
এইদেশে সৃষ্টি,
ধুপছায়া যার শাড়ী
তার হাসি মিষ্টি|
মুখখানি মিষ্টিরে
চোখদুটি ভোমরা
ভাব-কদমের - ভরা
রূপ দেখ তোমরা !
ময়নামতীর জুটি
ওর নামই টগরী,
ওর পায়ে ঢেউ ভেঙে
জল হোলো গোখরী!
ডাক পাখী ওর লাগি'
ডাক ডেকে হদ্দ,
ওর তরে সোঁত-জলে
ফুল ফোটে পদ্ম|
ওর তরে মন্থরে
নদ হেথা চলছে,
জলপিপি ওর মৃদু
বোল বুঝি বোলছে|
দুইতীরে গ্রামগুলি
ওর জয়ই গাইছে,
গঞ্জে যে নৌকা সে
ওর মুখই চাইছে|
আটকেছে যেই ডিঙা
চাইছে সে পর্শ,
সঙ্কটে শক্তি ও
সংসারে হর্ষ|
পান বিনে ঠোঁট রাঙা
চোখ কালো ভোমরা,
রূপশালী-ধান-ভানা
রূপ দেখ তোমরা

* * * *

পান সুপারি! পান সুপারি!
এইখানেতে শঙ্কা ভারি,
পাঁচ পীরেরই শীর্ণি মেনে
চলরে টেনে বৈঠা হেনে;
বাঁক সমুখে, সামনে ঝুঁকে
বাঁয় বাঁচিয়ে ডাইনে রুখে
বুক দে টানো, বইটা হানো -
সাত সতেরো কোপ কোপানো|
হাড়-বেরুনো খেজুরগুলো
ডাইনী যেন ঝামর-চুলো
নাচতে ছিল সন্ধ্যাগমে
লোক দেখে কি থমকে গেল|
জমজমাটে জাঁকিয়ে ক্রমে
রাত্রি এল রাত্রি এল|
ঝাপসা আলোয় চরের ভিতে
ফিরছে কারা মাছের পাছে,
পীর বদরের কুদরতিতে
নৌকা বাঁধা হিজল-গাছে|

* * * *

আর জোর দেড় ক্রোশ -
জোর দের ঘন্টা,
টান ভাই টান সব -
নেই উত্কণ্ঠা|
চাপ চাপ শ্যাওলার
দ্বীপ সব সার সার,
বৈঠৈর ঘায়ে সেই
দ্বীপ সব নড়ছে,
ভিল্ ভিলে হাঁস তায়
জল-গায় চড়ছে|
ওই মেঘ জমছে,
চল্ ভাই সমঝে,
গান গাও দাও শিশ,
বকশিশ! বকশিশ!
খুব জোর ডুব-জল
বয় স্রোত ঝিরঝির,
নেই ঢেউ কল্লোল,
নয় দুর নয় তীর|
নেই নেই শঙ্কা,
চল্ সব ফুর্তি,
বকশিশ টঙ্কা,
বকশিশ ফুর্তি|
ঘোর-ঘোর সন্ধ্যায়,
ঝাউ-গাছ দুলছে,
ঢোল-কলমীর ফুল
তন্দ্রায় ঢুলছে|
লকলক শর-বন
বক তায় মগ্ন,
চুপচাপ চারদিক -
সন্ধ্যার লগ্ন|
চারদিক নিঃসাড়,
ঘোর-ঘোর রাত্রি,
ছিপ-খান তিন-দাঁড়,
চারজন যাত্রি|

* * * *

জড়ায় ঝাঁঝি দাঁড়ের মুখে
ঝউয়ের বীথি হাওয়ায় ঝুঁকে
ঝিমায় বুঝি ঝিঁঝিঁর গানে -
স্বপন পানে পরাণ টানে|
তারায় ভরা আকাশ ওকি
ভুলোয় পেয়ে ধূলোর পরে
লুটিয়ে পল আচম্বিতে
কুহক-মোহ-মন্ত্র-ভরে!

* * * *

কেবল তারা! কেবল তারা!
শেষের শিরে মানিক পারা,
হিসাব নাহি সংখ্যা নাহি
কেবল তারা যেথায় চাহি|
কোথায় এল নৌকাখানা
তারার ঝড়ে হই রে কাণা,
পথ ভুলে কি এই তিমিরে
নৌকা চলে আকাশ চিরে!
জ্বলছে তারা! নিভছে তারা!
মন্দাকিনীর মন্দ সোঁতায়,
যাচ্ছে ভেসে যাচ্ছে কোথায়
জোনাক যেন পন্থা-হারা|
তারায় আজি ঝামর হাওয়া-
ঝামর আজি আঁধার রাতি,
অগুনতি অফুরান তারা
জ্বালায় যেন জোনাক-বাতি|
কালো নদীর দুই কিনারে
কল্পতরু কুঞ্জ কি রে?
ফুল ফুটেছে ভারে ভারে -
ফুল ফুটেছে মাণিক হীরে|
বিনা হাওয়ায় ঝিলমিলিয়ে
পাপড়ি মেলে মাণিক-মালা;
বিনি নাড়ায় ফুল ঝরিছে
ফুল পড়িছে জোনাক জ্বালা|
চোখে কেমন লগছে ধাঁধা -
লাগছে যেন কেমন পারা,
তারাগুলোই জোনাক হল
কিম্বা জোনাক হল তারা|
নিথর জলে নিজের ছায়া
দেখছে আকাশ ভরা তারায়,
ছায়া-জোনাক আলিঙ্গিতে
জলে জোনাক দিশে হারায়|
দিশে হারায় যায় ভেসে যায়
স্রোতের টানে কোন্ দেশে রে?
মরা গাঙ আর সুর-সরিত্
এক হয়ে যেথায় মেশে রে!
কোথায় তারা ফুরিয়েছে, আর
জোনাক কোথা হয় সুরু যে
নেই কিছুরই ঠিক ঠিকানা
চোখ যে আলা রতন উঁছে|
আলেয়াগুলো দপদপিয়ে
জ্বলছে নিবে, নিবছে জ্বলে',
উল্কোমুখী জিব মেলিয়ে
চাটছে বাতাশ আকাশ-কোলে!
আলেয়া-হেন ডাক-পেয়াদা
আলেয়া হতে ধায় জেয়াদা
একলা ছোটে বন বাদাড়ে
ল্যাম্পো-হাতে লকড়ি ঘাড়ে;
সাপ মানে না, ভাঘ জানে না,
ভূতগুলো তার সবাই চেনা,
ছুটছে চিঠি পত্র নিয়ে
রণরণিয়ে হনহনিয়ে|
বাঁশের ঝোপে জাগছে সাড়া,
কোল্-কুঁজো বাঁশ হচ্ছে খাড়া,
জাগছে হাওয়া জলের ধারে,
চাঁদ ওঠেনি আজ আঁধারে!
শুকতারাটি আজ নিশীথে
দিচ্ছে আলো পিচকিরিতে,
রাস্তা এঁকে সেই আলোতে
ছিপ চলেছে নিঝুম স্রোতে|
ফিরছে হাওয়া গায় ফুঁ-দেওয়া,
মাল্লা মাঝি পড়ছে থকে;
রাঙা আলোর লোভ দেখিয়ে
ধরছে কারা মাছগুলোকে!
চলছে তরী চলছে তরী -
আর কত পথ? আর ক'ঘড়ি?
এই যে ভিড়াই, ওই যে বাড়ী,
ওই যে অন্ধকারের কাঁড়ি -
ওই বাঁধা-বট ওর পিছন্
দেখছ আলো? ঐতো কুঠি
ঐখানেতে পৌঁছে দিলেই
রাতের মতন আজকে ছুটি|
ঝপ ঝপ তিনখান
দাঁড় জোর চলছে,
তিনজন মাল্লার
হাত সব জ্বলছে;
গুরগুর মেঘ সব
গায় মেঘ মল্লার,
দূর-পাল্লার শেষ
হাল্লাক্ মাল্লার!

জবা

জবা
লেখক: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ক্যাটাগরী: বাংলা কবিতা

আমারে লইয়া সুখী হও তুমি ওগো দেবী শবাসনা,
আর খুঁজিও না মানব-শোনিত, আর তুমি খুঁজিও না|
আর মানুষের হৃত্ পিণ্ডটা নিওনা খড়গে ছিঁড়ে,
হাহকার তুমি তুলো না গো আর সুখের নিভৃত নীড়ে|
এই দেখ আমি উঠেছি ফুটিয়া উজলি পুষ্পসভা,
ব্যথিত ধরার হৃত্ পিণ্ডটি আমি যে রক্তজবা|
তোমার চরণে নিবেদিত আমি, আমি যে তোমার বলি,
দৃষ্টি-ভোগের রাঙ্গা খর্পরে রক্ত কলিজা-কলি|
আমারে লইয়া খুশি হও ওগো, নম দেবি নম নম,
ধরার অর্ঘ্য করিয়া গ্রহণ, ধরার শিশুরে ক্ষম|

চম্পা

চম্পা
লেখক: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
ক্যাটাগরী: বাংলা কবিতা

আমারে ফুটিতে হ'লো বসন্তের অন্তিম নিশ্বাসে,
বিষণ্ণ যখন বিশ্ব নির্মম গ্রীষ্মের পদানত;
রুদ্র তপস্যার বনে আধ ত্রাসে আধেক উল্লাসে,
একাকী আসিতে হ'লো -- সাহসিকা অপ্সরার মতো|

বনানী শোষণ-ক্লিষ্ট মর্মরি' উঠিল এক বার,
বারেক বিমর্ষ কুঞ্জে শোনা গেল ক্লান্ত কুহু স্বর;
জন্ম-যবনিকা-প্রান্তে মেলি' নব নেত্র সুকুমার
দেখিলাম জলস্থল, -- শুন্য, শুষ্ক, বিহ্বল, জর্জর|

তবু এনু বাহিরিয়া, -- বিশ্বাসের বৃন্তে বেপমান, --
চম্পা আমি, -- খর তাপে আমি কভু ঝরিবো না মরি,
উগ্র মদ্য-সম রৌদ্র -- যার তেজে বিশ্ব মুহ্যমান, --
বিধাতার আশির্বাদে আমি তা সহজে পান করি|

ধীরে এনু বাহিরিয়া, ঊষার আতপ্ত কর ধরি';
মূর্ছে দেহ, মোহে মন, -- মুহুর্মুহু করি অনুভব!
সূর্যের বিভূতি তবু লাবণ্যে দিতেছ তনু ভরি';
দিনদেবে নমস্কার! আমি চম্পা! সূর্যের সৌরভ|